অন্যায়ভাবে মানব হত্যার পরিণতি

ফায়ছাল মাহমূদ 38 বার পঠিত

ভূমিকা : পৃথিবীতে সুশৃংখলভাবে জীবন যাপনের জন্য আল্লাহ মানুষকে শারঈ বিধান দিয়েছেন। যাতে মানব সভ্যতায় বিনা কারণে কোন রক্তপাত না হয়। মানব জীবনের সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে এই মূলনীতি এত গুরুত্বপূর্ণ যে, কাউকে হত্যা করা তো দূরের কথা, কোন অমুসলিমকে কষ্ট দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ। এমনকি কোন মুসলমানকে গালি দেওয়াও নিষেধ রয়েছে। তাই শারঈ কারণ ছাড়া মানব হত্যা হারাম ও কবীরা গুনাহ। বর্তমানে দুনিয়াবী স্বার্থে নিরপরাধ মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা, গুম এক নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক নিহত ব্যক্তির পরিবার জানতেই পারে না, কি কারণে তার পিতা, স্বামী বা ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে অন্যায়ভাবে মানব হত্যার পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা হ’ল।-

মানবজীবনের মর্যাদা : মানবজীবনের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূল (ছাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষণে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, হে লোক সকল! তোমাদের জান-মাল, ইযযত আব্রুর উপর হস্তক্ষেপ তোমাদের জন্য হারাম করা হ’ল। তোমাদের আজকের এই পবিত্র দিন, এই পবিত্র (যিলহজ্জ) মাস, এই শহর (মক্কা) যেমন পবিত্র ও সম্মানিত, অনুরূপভাবে উপরোক্ত জিনিসগুলোও সম্মানিত ও পবিত্র। সাবধান আমার পরে তোমরা পরস্পরের হন্তা হয়ে কাফেরদের দলভুক্ত হয়ে যেও না’।[1] অতঃপর রাসূল (ছাঃ) এই নছীহত কার্যকর করতে গিয়ে সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বলেন, জাহিলী যুগের যাবতীয় হত্যা রহিত হ’ল। প্রথম যে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ আমি রহিত করলাম, তা হচ্ছে আমার বংশের রবী‘আ ইবনুল হারিছের দুগ্ধপোষ্য শিশু হত্যার প্রতিশোধ। যাকে হুযাইল গোত্রের লোকেরা হত্যা করেছিল। আজ আমি তা ক্ষমা করে দিলাম’।[2]

ইসলামে বিবাদ বা গালি দেওয়ার বিধান : ইসলামই সর্বশেষ এলাহী গ্রন্থ, যেখানে বিশ্বময় শান্তির উপায় বলে দেওয়া আছে। হত্যা করে কখনোই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বরং পারস্পরিক সহমর্মিতাই শান্তির আবহ নিয়ে আসতে পারে। আর এজন্যই রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পারস্পরিক বিবাদকে কাফেরদের দলে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার শামিল গণ্য করে বলেন,لاَ تَرْجِعُنَّ بَعْدِى كُفَّارًا يَضْرِبُ بَعْضُكُمْ رِقَابَ بَعْضٍ- ‘তোমরা আমার অবর্তমানে কাফেরের দলে প্রত্যাবর্তন করো না যে, পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হবে’।[3] সাথে সাথে রাসূল (ছাঃ) গালির মাধ্যমে কষ্ট দেওয়াকে ফাসেক্বীর সাথে তুলনা করে বলেন, سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ- ‘মুসলিমদের গালাগালি করা ফাসিক্বী এবং খুনাখুনি করা কুফরী’।[4]

ইসলামে আত্মহত্যার বিধান : ইসলামে অন্যায়ভাবে মানব হত্যা তো দূরের কথা, নিজেকে আত্মহুতি দেওয়াও নিষেধ। আত্মহত্যার পরকালীন পরিণতি হ’ল জাহান্নাম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি যে বস্ত্ত দ্বারা নিজেকে হত্যা করবে, সেই বস্ত্ত দ্বারা তাকে ক্বিয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে’।[5] এমনকি যখমের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে জনৈক ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে আল্লাহ বলেন, বান্দা আমার আগেই নিজের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেছে। অতএব তার উপরে আমি জান্নাতকে হারাম করে দিলাম’।[6] এমনকি জিহাদের ময়দানে আত্মঘাতি বীর মুজাহিদকেও রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জাহান্নামী বলেছেন’।[7]

ভ্রুণহত্যা মানব হত্যার শামিল : ভ্রূণ নষ্ট করাও যেখানে ইসলামে পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ। সেখানে ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশে ভ্রূণ নষ্ট করা এবং নবজাতককে হত্যা করে রাস্তার পাশে ফেলে রাখা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ একজন মানুষ হত্যা আর ভ্রূণ হত্যার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কেননা যেনাকার জনৈকা গামেদী মহিলার উপর যেনার হদ্দ রাসূল (ছাঃ) কায়েম না করে সন্তান প্রসবের অপেক্ষা করতে বলেন।[8] এক্ষণে এ কাজে সহযোগী ডাক্তারগণ সাবধান হবেন কী? অথচ রাসূল (ছাঃ) উম্মতের সংখ্যাধিকার ব্যাপারে গর্ববোধ করবেন।[9]

অন্যায়ভাবে হত্যা করা হারাম : মুসলিম বা অমুসলিম যে ব্যক্তিই হৌক বিনা অপরাধে হত্যা করা মহা অপরাধ। আর যদি নিরাপরাধ ব্যক্তি হত্যা হয়ে যায়, সেটা সমগ্র জাতি হত্যা সমতুল্য। আল্লাহ বলেন,مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا- ‘যে কেউ জীবনের বদলে জীবন অথবা জনপদে অনর্থ সৃষ্টি করা ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করে। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করে’ (মায়েদাহ ৫/৩২)। আর এজন্যই রাসূল (ছাঃ) বলেন,لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ قَتْلِ رَجُلٍ مُسْلِمٍ- ‘কোন মুসলিম ব্যক্তির নিহত হওয়া অপেক্ষা সমগ্র পৃথিবীর ধ্বংস হওয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে অতি তুচ্ছ ব্যাপার’।[10]

পৃথিবীতে প্রথম হত্যাকারী ও তার শাস্তি : মানব ইতিহাসে হত্যার সূচনা হয় আদম (আঃ)-এর পুত্র কাবীল কর্তৃক হাবীলকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এ হত্যা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এসেছে,لَئِنْ بَسَطتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِيْ مَا أَنَاْ بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لَأَقْتُلَكَ إِنِّيْ أَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعَالَمِيْنَ- ‘তুমি যদি তোমার হাত আমার দিকে প্রসারিত কর আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে, আমি কিন্তু আমার হাত তোমার দিকে তোমাকে হত্যা করার জন্য প্রসারিত করব না। কেননা আমি বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি’ (মায়েদাহ ৫/২৮)

এ সম্পর্কে হাদীছে এসেছে পৃথিবীতে সংঘটিত সকল হত্যার একটি অংশ কাবীল পাবে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لَا تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الْأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ- ‘যে ব্যক্তিকেই অন্যায়ভাবে হত্যা করা হোক, তার খুনের (গুনাহের) একটি অংশ প্রথম হত্যাকারী আদম সন্তানের ওপর বর্তাবে। কারণ সে-ই (আদমের সন্তান কাবীল) প্রথম হত্যার প্রচলন করেছিল’।[11]

রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَمَنْ سَنَّ فِى الإِسْلاَمِ سُنَّةً سَيِّئَةً كَانَ عَلَيْهِ وِزْرُهَا وَوِزْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا مِنْ بَعْدِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَوْزَارِهِمْ شَىْءٌ- ‘যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে মন্দ রীতি চালু করল এবং লোকেরা তার এই রীতি আমল করল, ঐ ব্যক্তির আমলনামায় উক্ত রীতির অনুসারীদের সমপরিমাণ গোনাহ প্রদান করা হবে। কিন্তু তাদের গোনাহ হ’তে সামান্য পরিমাণও হ্রাস করা হবে না’।[12]

যুদ্ধের মাঠেও শত্রুকে হত্যায় সতর্কতা : মিকদাদ ইবনু ‘আমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি একজন অমুসলিম কাফের ব্যক্তির সম্মুখীন হই, আর সে তার তরবারির আঘাতে আমার একটি হাত কেটে ফেলে। পরে সে একটি বৃক্ষের আশ্রয়ে বলতে থাকে, ‘আমি ইসলাম কবুল করছি, আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করছি- এই কথা বলার পর আমি কি তাকে হত্যা করব? রাসূল (ছাঃ) বললেন, না, তুমি তাকে হত্যা করবে না। রাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আমার একটি হাত কেটে ফেলে ঐ কথা বলেছে। তবুও কি আমি তাকে হত্যা করব না? রাসূল (ছাঃ) বললেন, না, তুমি তাকে হত্যা করবে না। তুমি যদি তাকে হত্যা কর, তাহ’লে তাকে হত্যা করার পূর্বে তুমি যে অবস্থায় ছিলে, হত্যার পর সেই অবস্থায় ফিরে যাবে। আর সে যা বলছে, তা বলার পূর্বে সে যে অবস্থায় ছিল, তুমি সে অবস্থায় পৌঁছে যাবে’।[13]

যুদ্ধের সময় নারী-শিশু হত্যায় নিষেধাজ্ঞা : ইসলামে যুদ্ধের সময়েও নারী-শিশু হত্যাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইবনু ওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল (ছাঃ)-এর এক যুদ্ধে একজন নিহত মহিলাকে পাওয়া যায়। (এটা দেখে) তখন মহানবী (ছাঃ) তা অপসন্দ করেন’।[14] অন্য হাদীছে এসেছে, রাসূল (ছাঃ) যুদ্ধাবস্থাতেও নারী ও শিশু হত্যাকে নিষেধ করেছেন।[15] কিন্তু জঙ্গীরা যুদ্ধের সময় তো নয়ই বরং স্বাভাবিক অবস্থাতেও বিভিন্ন স্থানে বোমা মেরে অগণিত নারী-শিশু হত্যা করে চলেছে।

আল্লাহ বলেন,وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لاَ تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُوْنَ الدِّيْنُ لِلَّهِ ‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর যতক্ষণ না ফিৎনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন পূর্ণরূপে আল্ললাহর জন্যে হয়ে যায়’ (বাক্বারাহ ২/১৯৩; আনফাল ৮/৩৯)। ইবনে ওমর (রাঃ) এই হাদীছের ব্যাখ্যায় এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘তুমি কি জান ফিৎনা কী? নবী করীম (ছাঃ) যুদ্ধ করতেন মুশরিকদের বিরুদ্ধে। তাদের উপরে আরোপিত হওয়াটাই ছিল ফিৎনা। তোমাদের মত যুদ্ধ নয়, যা হচ্ছে শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য’।[16]

ক্বিয়ামতের দিন প্রথম বিচারিক বিষয় : ক্বিয়ামতের দিন বান্দার হকগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম বিচার করা হবে অন্যায় রক্তপাত বা হত্যার। যেমন ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেন,أَوَّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ الصَّلَاةُ، وَأَوَّلُ مَا يُقْضَى بَيْنَ النَّاسِ فِي الدِّمَاءِ- ‘সর্বপ্রথম বান্দার ছালাতের হিসাবে নেয়া হবে। আর মানুষের পরস্পরের মাঝে সর্বপ্রথম বিচার করা হবে রক্তপাত বা অন্যায় হত্যার’।[17]

উল্লেখ্য, হাদীছের আলোকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর হক ও বান্দার হকের মধ্যে সর্বপ্রথম আল্লাহর হকের হিসাব নেওয়া হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে? তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে নিঃস্ব হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যার দিরহামও (নগদ অর্থ) নেই, কোন সম্পদও নেই। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সেই ব্যক্তি হচ্ছে নিঃস্ব, যে ক্বিয়ামত দিবসে ছালাত, ছিয়াম, যাকাতসহ বহু আমল নিয়ে উপস্থিত হবে এবং এর সাথে সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, কারো সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, কারো রক্ত প্রবাহিত (হত্যা) করেছে, কাউকে মারধর করেছে ইত্যাদি অপরাধও নিয়ে আসবে। সে তখন বসবে এবং তার নেক আমল হ’তে এ ব্যক্তি কিছু নিয়ে যাবে ও ব্যক্তি কিছু নিয়ে যাবে। এভাবে সম্পূর্ণ বদলা (বিনিময়) নেয়ার আগেই তার সৎ আমল নিঃশেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহসমূহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে, তারপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’।[18]

ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে হত্যাকান্ড বৃদ্ধি : ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে হত্যাকান্ড বৃদ্ধি পাবে। বর্তমান সময়ে পত্র-পত্রিকায় খুললেই হর-হামেশা তার প্রমাণ পাওয়ায যায়। আর এজন্যই রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُقْبَضَ الْعِلْمُ، وَتَكْثُرَ الزَّلاَزِلُ، وَيَتَقَارَبَ الزَّمَانُ، وَتَظْهَرَ الْفِتَنُ، وَيَكْثُرَ الْهَرْجُ وَهْوَ الْقَتْلُ الْقَتْلُ حَتَّى يَكْثُرَ فِيكُمُ الْمَالُ فَيَفِيضُ- ‘ক্বিয়ামত কায়েম হবে না, যে পর্যন্ত না ইল্ম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে এবং হারজ বা হত্যাকান্ড ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। হারজ অর্থ খুনখারাবী। তোমাদের সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে, উপচে পড়বে’।[19]

অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘ক্বিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে হারজ হবে। রাবী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ‘হারজ’ কী? তিনি বলেন, ব্যাপক গণহত্যা। কতক মুসলমান বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এখন এই এক বছরে এত মুশরিককে হত্যা করেছি। রাসূল (ছাঃ) বলেন, তা মুশরিকদের হত্যা করা নয়, বরং তোমরা পরস্পরকে হত্যা করবে। এমনকি কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে, চাচাকে, চাচাতো ভাইকে এবং নিকটাত্মীয়কে পর্যন্ত হত্যা করবে। তারা বলল, সুবহানাল্লাহ! হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! তখন কি আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাবে?

রাসূল (ছাঃ) বললেন, না। তবে সে সময়ের অধিকাংশ লোকের জ্ঞান লোপ পাবে। তাদের কেউ কেউ মনে করবে সে একটি বিষয়ের উপর আছে। অথচ সে থাকবে অন্য বিষয়ের উপর। এরপর তিনি বললেন, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তাঁর শপথ! আমি আশঙ্কা করছি যে, সে অবস্থা আমাকে পেয়ে বসবে। আর তোমরা অবশ্যই উক্ত বিষয়গুলো থেকে নিজেদের রক্ষা করবে। (আবু মূসা আশ‘আরী বলেন,) হয়তো এ যুগ তোমাদেরকে ও আমাকে পেত, তাহ‘লে তা থেকে আমার ও তোমাদের বের হয়ে আসা মুশকিল হয়ে যেত, যেমন নবী করীম (ছাঃ) আমাদের জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, আমরা ঐ অনাচারে যত সহজে জড়িয়ে পড়ব তা থেকে বের হয়ে আসা ততোধিক দুষ্কর হবে’।[20]

বর্তমান সময়েও অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যায় যে, পিতা তার স্নেহের পুত্রকে হত্যা করেছে। সন্তান তার তার নেশার টাকা না পাওয়ার কারণে তার পিতা-মাতাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ভাই-ভাইয়ের মধ্যে সম্পদ নিয়ে মারামারি, কাটাকাটি এমনকি হত্যা করতে সামান্যতম অন্তর কাঁপে না। আর এ জন্যই রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يَقْتُلَ الرَّجُلُ جَارَهُ وَأَخَاهُ وَأَبَاهُ، ‘কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশী, তার ভাই এবং তার পিতাকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে না’।[21]

বড় আশ্চর্যের বিষয় হ’ল মানব হত্যা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তা-ঘাটে এখন মানুষ খুব একটা নিরাপত্তা লাভ করেনা। বর্তমান সময়ে অসংখ্য হত্যা হচ্ছে সামান্য অর্থ লাভের জন্য বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য। অথচ নিহত ব্যক্তি জানতেই পারছে না যে, তাকে হত্যা করা হবে। রাসূল (ছাঃ) এমনই পরিস্থিতি সংঘটিত হওয়ার আশংকা করে বলেছিলেন,وَالَّذِى نَفْسِى بِيَدِهِ لَيَأْتِيَنَّ عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ لاَ يَدْرِى الْقَاتِلُ فِىْ أَىِّ شَىْءٍ قَتَلَ وَلاَ يَدْرِى الْمَقْتُولُ عَلَى أَىِّ شَىْءٍ قُتِلَ ‘ঐ সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! মানুষের নিকট এমন এক সময় আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না যে, কি অপরাধে সে হত্যা করেছে এবং নিহত ব্যক্তিও জানবে না যে, কি অপরাধে সে নিহত হয়েছে’।[22]

চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যার পরিণতি : অমুসলিম বা মুসলিম ব্যক্তির কোন অপরাধ রাষ্ট্রীয় আদালত কর্তৃক প্রমাণিত হওয়ার পূর্বে কারো জন্য আইন হাতে তুলে নেওয়া জায়েয নয়। এরূপ করলে উক্ত ব্যক্তি কবীরা গুনাহগার হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرَحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ ‘চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে হত্যাকারী ব্যক্তি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না’।[23] আর চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম হ’ল, যাদের সাথে মুসলমানদের জিযিয়া চুক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে সন্ধি অথবা কোন মুসলিমের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে’।[24]

(ক্রমশ)

[কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আহলেহাদীছ যুবসংঘ; শিক্ষক : আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী, রাজশাহী]


[1]. বুখারী হা/৬৭; মুসলিম হা/১২১৮।

[2]. মুসলিম হা/১২১৮।

[3]. বুখারী হা/৬৭৮৫; আহমাদ হা/২১০৩৮; মিশকাত হা/৩৫৩৭।

[4]. বুখারী হা/৪৮; তিরমিযী হা/১৯৮৩; মিশকাত হা/৪৮১৪।

[5]. বুখারী হা/১৩৬৫; মিশকাত হা/৩৪৫৪, ‘ক্বিছাছ’ অধ্যায়।

[6]. বুখারী হা/১৩৬৪।

[7]. বুখারী হা/৪২০৩; মিশকাত হা/৫৮৯২।

[8]. মুসলিম হা/১৬৯৫; মিশকাত হা/৩৫৬২।

[9]. আবুদাঊদ হা/২০৫০; নাসাঈ হা/৩২২৭; মিশকাত হা/৩০৯১।

[10]. বুখারী, তিরমিযী হা/১৩৯৫।

[11]. বুখারী হা/৩৩৩৬; মুসলিম হা/১৬৩৭; মিশকাত হা/২১১।

[12]. মুসলিম হা/৪৮৩০ (২৩৯৮)।

[13]. বুখারী হা/৪০১৯; মিশকাত হা/৩৪৪৯।

[14]. বুখারী হা/৩০১৪; মুসলিম হা/১৭৪৪।

[15]. বুখারী হা/৩০১৫।

[16]. বুখারী হা/৪৬৫১, ৭০৯৫।

[17]. নাসাঈ হা/৩৯৭১; ছহীহাহ হা/১৭৪৮; ছহীহুল জামে হা/২৫৭২।

[18]. মুসলিম হা/২৫৮১; তিরমিযী হা/২৪১৮; মিশকাত হা/৫১২৭।

[19]. বুখারী হা/১০৩৬; মুসলিম হা/১৫৭; মিশকাত হা/৫৪১০।

[20]. হাকেম হা/৮৫৮৭; আহমাদ হা/১৯৬৫৩; ছহীহাহ হা/১৬৮২।

[21]. আল-আদাবুল মুফরাদ হা/১১৮; ছহীহাহ হা/৩১৮৫।

[22]. মুসলিম হা/২৯০৮; মিশকাত হা/৫৩৯০; ছহীহুল জামে‘ হা/৭০৭।

[23]. বুখারী হা/৩১৬৬, মিশকাত হা/৩৪৫২।

[24]. ফাৎহুল বারী ১২/২৫৯ পৃ.।



আরও